শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৫ অপরাহ্ন
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ৯৮টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩ হাজার ১৮১ কোটি ৫৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। এর পাশাপাশি, তার কাছে ৩৬ কোটি ৩৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ থাকার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি।
এছাড়াও, বিপু, তার স্ত্রী সীমা হামিদ এবং ছেলে জারিফ হামিদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক মামলা করেছে দুদক। প্রতিটি মামলায় নসরুল হামিদ আসামি হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। গতকাল, দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান এসব মামলা দায়ের করেন। একই দিনে, সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিপুর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বা সম্পত্তির অবৈধ উৎস লুকানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন লেনদেন করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে দুদক আইন-২০০৪-এর ২৭(১) ধারা, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
দ্বিতীয় মামলায় নসরুল হামিদ ও তার ছেলে জারিফ হামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় জারিফের বিরুদ্ধে ২০ কোটি ৮৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, তার ২০টি ব্যাংক হিসাবে ২৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা জমা ও ১৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা উত্তোলন হয়েছে। এই লেনদেনগুলি অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক, যা মানি লন্ডারিং অপরাধের আওতায় পড়ে। অভিযোগ করা হচ্ছে যে, নসরুল হামিদের প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারে তার ছেলে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।
সূত্র জানাচ্ছে, নসরুল হামিদের নির্দেশে মিটার উৎপাদন এবং সরাসরি সরবরাহের জন্য দুটি নতুন সরকারি কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বেসিকো)। এতে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ৫১ শতাংশ এবং চীনের হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড ৪৯ শতাংশ শেয়ার নেয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। হেক্সিংয়ের স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন নসরুল হামিদের বন্ধু আলমগীর শামসুল আলামীন। আরেকটি কোম্পানি, বাংলাদেশ পাওয়ার ইক্যুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (বিপিইএমসি) স্মার্ট প্রিপেইড মিটার তৈরির জন্য গঠিত হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) ৫১ শতাংশ শেয়ার এবং চীনের সেনজেন স্টার ইনস্ট্রুমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ৪৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে এই কোম্পানির নিবন্ধন করে। সেনজেন স্টারের স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন নসরুল হামিদের আত্মীয় মাহবুব রহমান, যিনি তরুণ নামে পরিচিত।
দুদকের তদন্তকারীরা জানান, মিটার উৎপাদনের বদলে আমদানি করে মিটার সরবরাহের জন্য এই দুটি কোম্পানি কাজ করেছে। তারা বাজারদরের চেয়ে বেশি দাম দেখিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করেছে। দরপত্র ছাড়াই সরাসরি মিটার সরবরাহের সুযোগ পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে, ওজোপাডিকো বেসিকোর মিটার সরবরাহ কার্যক্রমের ওপর একটি নিরীক্ষা চালায়, যেখানে দেখা যায় যে, মিটার তৈরির বদলে তা আমদানি করা হয়েছে। আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে ৩৬ কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ২০২২ সালে, টাকা পাচারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে একটি চিঠি পাঠানো হয়। একই সময়ে, ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরবর্তীতে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওই মামলা তুলে নেওয়া হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অভিযোগ প্রত্যাহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই সময়ে, বোর্ড সভাপতি ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব নূরুল আলম, যিনি পরে জ্বালানি বিভাগের সচিব হন। তাকে এই ভূমিকা পালনের জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে, পরবর্তীতে তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।